।মোঃ শফিকুল ইসলাম।

(পর্ব)

অ্যাপোলো সয়ুজের হাত ধরে আর হাজারটা চড়াই উতরাই পেরিয়ে সোভিয়েত-মার্কিন শতাব্দীকালব্যাপী মহাকাশ যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে মহাশূন্যে স্থায়ীভাবে অবস্থান করার মত একটি যান ‘International Space Station (ISS)’ এর জন্ম হয় উনিশ শতকের শেষভাগে।

১৯৯৮ সালের নভেম্বরে রাশিয়া ISS-এর প্রথম মডিউল মহাকশে স্থাপনের মাধ্যমে এর অফিসিয়াল যাত্রা শুরু হয়। এবং শেষ মডিউলটি যুক্ত করা হয় ২০১১ সালে। তবে সংযোজন বিযোজন চলছে আজ অব্দি। স্টেশনটি ২০৩০ সাল পর্যন্ত চলার উপযোগী করে ডিজাইন করা হয়েছে।

রাশিয়ান স্পেস স্টাশন মিরের সফলতা এবং স্পেস বিল্ডিং মেকানিজম ISS তৈরির পথ সুগম করে দেয়। ISS-এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪০ ফিট, প্রস্থ প্রায় ৩৬০ ফিট এবং উচ্চতা প্রায় ৭০ ফিট। এর মোট ভর প্রায় ৪২০ টন (১ টন = ১০০০ কেজি) ।

পৃথিবীর বাইরে এর আগে এই সাইজের এবং ভরের কোন কিছু স্থাপন করা হয়নি। তাই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জে হাতছানি দিতে থাকে। ISS তৈরি হবার পর এর জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর যে হুমকি দাঁড়ায় তা হল এর বিরাট আকার।

এর আকারের কারণে এটি খুব সহজেই মহাশূন্যের যেকোন বাসমান বস্তুর সাথে খুব সহজেই দুর্ঘটনায় পতিত হতে পারে। আগের মহাকশযান বা স্পেস ষ্টেশনগুলো আকারে ছোট হওয়ায় এই দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কম ছিল। এই ভাসমান বস্তু হতে পারে উল্কাপিন্ড, গ্রহাণুপুঞ্জ বা মহাকাশের ধুলোবালি।

স্পেস জাংক

চিত্র-১: স্পেস জাংক- স্টেশনের শত্রু

ধুলোবালি? মহাকাশে কি আবার ধুলোবালিও আছে? থাকলেও এই ধুলোবালি কি এত বড় যানের কোন ক্ষতি করতে পারবে? উভয় ক্ষেত্রেই উত্তর হল- হ্যাঁ আছে এবং এই ধুলোবালি বা স্পেস জাংকই ISS-এর জন্য সবচেয়ে মারাত্মক হুমকি।

কারণ বড় উল্কাপিন্ড বা গ্রহাণুপুঞ্জ খুব সহজেই রাডারের মাধ্যমে চিহ্নিত করা যায় এবং অনেক দূরে থাকতেই নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু স্পেস ডাস্ট আকারে অনেক ছোট হওয়ায় এদের রাডারে খুঁজে পাওয়া অনেক কঠিন।

আর অনেক বেশি গতি সম্পন্ন হওয়ার কারণে এই ছোট ছোট স্পেস ডাস্টের আঘাতেই ভয়ংকর পরিণতি ঘটতে স্পেস স্টেশনের। একটি বালির পরিমাণ স্পেস জাংকও যদি অরবিটাল বেগে ISS-কে আঘাত করে তাহলে এর দেয়াল চূর্ণ হয়ে যাবে।

মহাশূন্যে প্রায় এক লক্ষেরও বেশি সংখ্যক স্পেস জাংক আছে যা নিত্যনিয়মিত উচ্চ গতিবেগ সহকারে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে (নিচের ছবি দ্রষ্টব্য) । এসব স্পেস জাংকের অন্যতম উৎস হল মহাকশে পরিত্যক্ত রকেট বা মহাকাশযান যেগুলো পৃথিবীতে ফেরত আনা হয় না।

আগেই বলেছি, রকেট মূলত ব্যবহার করা হয় মহাকাশযানকে পৃথিবীর গন্ডির বাইরে নেয়ার জন্য এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মহাকাশযানগুলোও পৃথিবীতে ফেরত আনা হয় না কারণ তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কেন ব্যয়বহুল তা নিয়ে চিন্তা করার দায়িত্ব তোমাদের উপর ছেড়ে দিলাম।

স্পেস জাংক

চিত্র-২: স্পেস জাংক ঘিরে রেখেছে পৃথিবীকে

মহাকাশযানের দেয়াল সাধারণত অ্যালুমিনিয়ামের পাত দ্বারা তৈরি। এখন এই দেয়াল যদি অনেক মোটা আর পুরু পাতের দ্বারা তৈরি করা যায় তবে তা অনেক স্পেস জাংক আটকে দিতে পারবে। কিন্তু এতে ভর অনেক বেড়ে যাবে ফলে পৃথিবী থেকে তা নেয়াও অনেক কষ্ট সাপেক্ষ হবে। এবং তা আকারে বড় সাইজের পার্টিকেল প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হতে পারে।

এজন্য বিজ্ঞানীরা অনেক মোটা পাতের পারিবর্তে দুইটা পাতলা পাত আর মাঝখানে ফাঁকা যায়গা রাখার পরামর্শ দেয়। এতে করে একটি কণা যদি বাইরের পাতকে আঘাত করে তাহলে উচ্চ গতিবেগের কারণে তা হয়তো বাইরের পাতকে ছিদ্র করতে পারে কিন্তু দ্বিতীয় পাতকে আঘাত করার আগে এটি অনেক দুর্বল হয়ে যাবে এবং অনেক ছড়িয়ে পড়বে যেমনটা হয় আলোর বিচ্ছুরণের ক্ষেত্রে।

ফলে কণাটি যদি দ্বিতীয় পাতকে আঘাত করতেও সক্ষম হয় তবুও তা গর্ত করতে পারবে না। আর যদি দুই পাতের মাঝখানে নরম কিন্তু শক্তিশালী কোন আবরণ দেওয়া যায় তাহলে ভেতরের পাত অক্ষত রয়ে যাবে। শক্তিশালী আর নরম এই বস্তুর নাম হল কেভলার (Kevlar) যা দিয়ে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট তৈরি করা হয়।

ISS-এর ভেতরের দেয়াল কে পুরু কেভলার দিয়ে আবৃত করে দেওয়া হয় আর তার বাইরে থাকে আরেক পাতলা দেয়াল। ফলে স্পেস জাংক বাইরের দেয়ালকে ঘায়েল করতে পারলেও কেভলারকে ঘায়েল করে ভেতরের দেয়ালের ক্ষতি করা প্রায় অসম্ভব।

এভাবেই ISS-কে বহিঃআক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেওয়া হয়। যদিও এলিয়েনদের (?) আক্রমণ থেকে কিভাবে সুরক্ষা দেওয়া হবে তা এখনো গবেষণার বিষয়!

ক্যানাডার্ম

চিত্র-৩: ক্যানাডার্ম একজন অ্যাস্ট্রোনাটকে ধরে রেখেছে

ISS মূলত গবেষণা এবং মহাশূন্যে জীবন যাপনের অভিজ্ঞতা লাভের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়। কিন্তু সমস্যা হল এখানে যারা প্রথম থাকবে এবং কাজ করবে তারা কীভাবে অভিকর্ষহীন (জিরো গ্র্যাভিটি) অবস্থায় সেটা করতে পারবে। পৃথিবীতে তো কোথাও জিরো গ্র্যাভিটি নেই যেখানে প্র্যাকটিস করে তারপর ISS-এ যাবে।

তো এই সমস্যার সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের জনসন স্পেস সেন্টারে পানির নিচে ISS-এর একটি ডুপ্লিকেট বা রেপ্লিকা (অনুলিপি) তৈরি করা হয়। তোমরা তো জানোই পানির নিচে অভিকর্ষ বল শূন্য না হলেও শূন্যের কাছাকাছি। বিশ্বাস না হলে পানির নিচে তোমার বন্ধুকে একটা ঘুষি দেয়ার চেষ্টা করে দেখতে পারো।

যাইহোক, জনসন স্পেস সেন্টারের পুকুরের ভিতরে থাকা ISS-এর অনুলিপিতে অ্যাস্ট্রোনাটগণ অনুশীলন করে তারপর মহাশূন্যে রওনা দিতো। তো জনসন স্পেস সেন্টারের পুকুরের নিচে কাজ করতে গিয়ে দেখা গেল পানির নিচে কাজ করা এত সহজ নয়। এমনকি রেইঞ্জ দিয়ে একটা স্ক্রু টাইট দিতেও অনেক কসরত করতে হয়।

তাহলে ISS-এর বিশাল বিশাল মডিউল আর কল-কব্জা জোড়াতালি (ডকিং) দেওয়া এবং নড়াচড়ার কাজ কে করবে? তাও আবার এমন বৈরি পরিবেশে! এই সমস্যার সমাধান করতে এগিয়ে এল ক্যানাডার্ম (Canadarm, ক্যানাডার তৈরি বলে এরকম নাম) আর ডেক্সটার (Dextre) নামক দুই ভদ্রলোক।

প্রথম জন হলেন একটি রোবটিক বাহু যার দৈর্ঘ্য ছোট বড় করা যায় এবং এটি মহাশূন্যে মালপত্র নড়াচাড়া, অ্যাস্ট্রোনাট/মডিউল ধরে রাখার পাশাপাশি স্ক্রুও টাইট দিতে পারে। আর ডেক্সটার হল একটি রোবট যা অ্যাস্ট্রোনাটরা ঘুমিয়ে গেলে জোড়াতালির কাজ করে।

চিত্র-৪: ডেক্সটার আর পাশে ক্যানাডার্ম

তোমাদের হয়তো ISS-এর ভেতরটা দেখতে কেমন আর এখানে মানুষ কীভাবে বাস করে তা খুব জানতে ইচ্ছে করছে। ISS-এর ভেতরটা অনেক কলকব্জা আর যন্ত্রপাতি, তার, কম্পিউটার ইত্যাদি দিয়ে ভর্তি বলে খুবই অগোছালো আর এলোমেলো মনে হবে। আর এখানকার জীবন যাপনও অদ্ভুত ধরনের।

কোন অভিকর্ষ বল না থাকায় মানুষসহ সব আলগা জিনিস এখানে ভাসমান থাকে। এভাবে ভাসমান থেকেই খাওয়া, কাজ, ঘুম, টয়লেট ইত্যাদি সবই করতে হয়। এখানে রান্নার ব্যবস্থা নেই বলে পৃথিবী থেকে খাবার (সাধারণত শুকনো) পাঠানো হয়।

আর ঘুমানোটা ‘যেখানেই রাত সেখানেই কাত’ টাইপের অর্থাৎ যে যেখানে আছে যেভাবে আছে সেভাবেই ঘুমাতে পারে কারণ ওখানে শোয়া বা বসার আলাদা কোন অনুভুতি নেই, সবই একরকম। অবশ্য সবার জন্যই আলাদা স্লিপিং ব্যাগের ব্যবস্থা আছে।

গ্র্যাভিটি না থাকায় শরীরের প্রয়োজনীয় নড়াচড়া কম হয় বলে রক্ত চলাচল আর পেশির ব্যালান্স রাখার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করতে হয় ওখানে। টয়লেট করাটা একটু হালকা জটিল। ভাবছো কি যে অ্যাস্ট্রোনাটরা রাতের বেলা ISS-এর দরজা খুলে একটু বাইরে গিয়ে প্রকৃতির ডাকে সারা দিয়ে আসে?

না ভাই, ISS-এ এসবের স্থান নেই। যদিও অনন্য অসীম মহাকাশ মানুষের এই ক্ষুদ্র অবদান গ্রহণ করতে অস্বীকার করতো না (!)। যাইহোক ISS-এর টয়লেটে একটা সরু সাকশন (যেটা বাতাস টেনে নিতে পারে) পাইপের মধ্যে টয়লেট করতে হয় যেটা মেশিন টেনে নিয়ে কোথাও জমা করে রাখে।

অ্যাস্ট্রোনাট

চিত্র-৫: ISS-এর অভ্যন্তরে একজন অ্যাস্ট্রোনাট দৌড়াচ্ছেন

ISS এখন আমেরিকা, রাশিয়া, ক্যানাডা, জাপান এবং ইউরোপের ২২ টি দেশের একটি যৌথ প্রোজেক্ট যা পৃথিবীর বাইরে মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও সহাবস্থানের একটি অনুপম সুন্দর দৃষ্টান্ত। কিন্তু পৃথিবী নামক এই গ্রহের অভ্যন্তরে মানুষে মানুষে হানাহানি, মারামারি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আজো কমেনি বরং বাড়ছে দিনদিন।

মহাকাশের মত পৃথিবীর বুকেও নেমে আসুক ভেদাভেদহীন স্নিগ্ধ শান্তির রজনী। আল্লাহ হাফিজ।

মার্চ-এপ্রিল ২০১৯। বর্ষ ৪। সংখ্যা ৬

চিনে রাখি অসুখগুলি

দুরন্ত বাড়ন্ত e

অবলোহিত আলো দেখতে চাও?

মস্তিষ্ক দখল

মহাবিশ্বের স্ফীতি

মাটির ভুবনে

তোমাদের প্রশ্ন আমাদের উত্তর

কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন

সহজে মিলাও সুডোকু

ফোটোনিক্স ও গবেষণা

মস্তিষ্ক দখল

ইভিএম কীভাবে কাজ করে?

পৃথিবীর বিপদ যত!

ইউরেনিয়াম: অবিশ্বাস্য শক্তির ভ্রুণ

একটি গ্রহ ও দুটি নিঃসঙ্গ কোটর

মহাশূন্যে বসবাস

চিনে রাখি অসুখগুলি

শুন্যে আমি

চুম্বকত্বের আদ্যপান্ত

অগ্রগতির যুগে চিকিৎসা বিজ্ঞান

মস্তিষ্ক দখল

অনুভূতির রহস্যে!

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

কার্বন ডেটিংয়ের জাদু

চিনে রাখি অসুখগুলি

মস্তিষ্ক দখল

পরমাণু থেকে কণার জগতে

সিন্ধুতীরের মুক্তার কথা

ধূমকেতুর গল্প